নরসিংদী ( Narsingdi) জেলার ইতিহাস

কথিত আছে, প্রাচীনকালে অঞ্চলটি নরসিংহ নামক রাজার শাসনাধীন ছিল আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজা নরসিংহ প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে নরসিংহপুর নামে একটি ছোট নগর স্থাপন করেছিলেন তারই নাম অনুসারে নরসিংদী নামটি আবির্ভূত হয় কালের বিবর্তনে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে অসংখ্য বসতি গড়ে উঠে। বর্তমানে সেটি নগর নরসিংহপুর মৌজা নরসিংহ গ্রাম নামে পরিচিত। নরসিংহ নামের সাথেদীযুক্ত হয়ে নরসিংদী হয়েছে নরসিংদী শব্দের পরিবর্তীরূপ-নরসিংদী পরবর্তীতে নরসিংদী জেলার অঞ্চলটি মহেশ্বরদী পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল পরগনার জমিদার ছিলেন দেওয়ান শরীফ খাঁ ও আয়শা আক্তার খাতুন জমিদার প্রথা বিলোপের পর একসময় নরসিংদী ছিল প্রশাসনিকভাবে ঢাকা জেলাধীন নারায়ণগঞ্জ মহকুমার একটি থানা। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে ঢাকা জেলার একটি মহকুমায় উন্নীত করা হয়

১৯৮৪ সালে নরসিংদী সদরপলাশ, শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব এবং রায়পুরা-এ ০৬টি উপজেলা এবং নরসিংদী পৌরসভা নিয়ে নরসিংদী জেলা
ঘোষণা করা হয় এবং শুরু হয় জেলার যাত্রা ।

নামকরণ : নরসিংদী নামকরণ নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক অনেক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে নরসিংদীর নামের ইতিহাস একটি বইয়ে পাওয়া যায়।সোনারগা ভূখণ্ডের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ধনপদসিংহ নামক জনৈক হিন্দু জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে রাজা খেতাব লাভ করেন। রাজা ধনপদসিংহের একমাত্র পুত্র নরসিংহ শীতলক্ষ্যা নদীর তিন মাইল পূর্বে, প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মহেশ্বরদী পরগনায় নগর নরসিংহপুর নামে একটি ছোট শহর প্রতিষ্ঠা করে বসবাস করতে থাকেন। বর্তমানে পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামটিই সেই শহর উক্ত রাজা নরসিংহের নাম থেকে নরসিংদী নামকরণ করা হয়েছে। 

পারুলিয়া শাহী মসজিদ


জেলার ঐতিহ্য : নরসিংদী বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন সমৃদ্ধ জেলা। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল মেঘনা বিধৌত ভূমি, পশ্চিমাঞ্চল উচ্চ সমতল ভূমি উত্তরাঞ্চলে ছোট ছোট পাহাড়, টিলাটেক নয়নাভিরাম অরণ্য আবরণে আবৃত।

এ জেলার উত্তরাঞ্চলে পাহাড়ি ভূমি বাংলাদেশের আদি ভূমির অন্তর্গত। এ জেলার আদি ভূমিতে অবস্থিত বেলাব উপজেলার ‘ওয়ারি বটেশ্বর গ্রামে পরিত্যক্ত ভিটা ও অসমরাজার গড় আবিস্কৃত হয়েছে, যা নব্য প্রস্তর যুগীয় সভ্যতার নিদর্শন । 

শিক্ষা,  শিল্পসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্যস্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। প্রাচ্যের ম্যানচেষ্টার’ বলে খ্যাত শেখেরচর (বাবুরহাট) এ জেলায় অবস্থিত 

কলা, কাঁকরোল, শশা, সিম,বেগুন ,ধান, পাট, আলু ও লটকন উৎপাদনে উলে­খযোগ্য নরসিংদী বাংলাদেশের একটি অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে।

নরসিংদীর  প্রধান নদীগুলো হচ্ছে মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, হাঁড়ীধোয়া, শীতলক্ষ্যা ও কলাগাছিয়া।

নরসিংদী জেলার আয়তন  হাজার ১৪০ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার, নরসিংদীর উত্তরে কিশোরগঞ্জদক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ  ব্রাহ্মণবাড়িয়াপূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া  কিশোরগঞ্জ এবং পশ্চিমে গাজীপুর জেলা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নরসিংদী  নং সেক্টরের অধীনে ছিল

নরসিংদীর  ঐতিহ্য:
৬৯ সালের গণ আন্দোলনের শহীদ ‘আসাদ’ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বীরশ্রেষ্ট ফ্লাইট লেফটেনেন্ট 'মতিউর' রহমানের জন্মভূমি নরসিংদী। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে যারা আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত করে নরসিংদীকে ঐতিহ্যমন্ডিত করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি আই.সি.এস. অফিসার স্যার কে.জি. গুপ্ত, গবেষক ও পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশ চনদ্র সেন। ১৮৩৫ সালে গিরিশচন্দ্র সেন নরসিংদীর পাঁচদোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী সাহিত্য সাধনা করে ১৮৮৬ সালে প্রথম পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ সম্পন্ন করেন। বাংলা সাহিত্যে এটাই তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ, চারিত্রিক উদারতা এবং সত্যবাদিতার জন্য গিরিশচন্দ্র সেন সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন এবং তিনি ছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক। তাই সকলে তাকে :ভাই গিরিশচন্দ্র" নামে ডাকত। ১৯১০ সালে গিরিশচন্দ্র সেনের কর্মময় জীবনের অবসান হয়। নরসিংদীর কৃতি সন্তান হিসেবে যাঁরা চিরকস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁরা হচ্ছেন বিখ্যাত কবিয়াল হরিচরণ আচার্য, যিনি ‘কবিগুণাকর’’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন, মৌলভী সেকান্দর আলী এবং কবি দ্বিজদাস। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শামসুর রাহমান, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক ড.আলাউদ্দি আল আজাদ, এবং দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক আহমদুল কবির মনু মিয়া নরসিংদী জেলারই গর্ব। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের বরনীয় শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আপেল মাহমুদ,  রাজনীতিক সুন্দর আলী গান্ধী, সতিশ পাকরাশী, কবিরাজ ললিত মোহন দাস, কামিনী কিশোর মল্লিক ও বিজয় চ্যাটার্জী এই জেলারই সন্তান।

সভ্যতার নিদর্শন: নরসিংদী জেলা বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন সমৃদ্ধ জেলা। এ জেলার বেলাব উপজেলার ‘ওয়ারী বটেশ্বর’ গ্রামে পরিত্যক্ত ভিটা ও অসমরাজার গড় আবিস্কৃত হয়েছে। যা নব্য প্রস্তর যুগীয় সভ্যতার নিদর্শন। ওয়ারীতে খৃষ্টপূর্বকালের ছাপাঙ্কিত পর্যাপ্ত রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। এসব মুদ্রা নরসিংদী অঞ্চলের আদি সভ্যতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ‘জয়মঙ্গল’নামে পাহাড়ী গ্রামে আবিস্কৃত হয়েছে গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা একই উপজেলার আশ্রাফপুরে আবিস্কৃত হয়েছে সপ্তম শতাব্দীর মহারাজা দেব খড়গের তাম্রলিপি এবং অষ্টধাতুর নির্মিত বৌদ্ধ নিবেদন স্ত্তপ। এই আশ্রাফপুরেই আবিস্কৃত হয়েছে গৌড়ের স্বাধীন নরপতি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নাসির উদ্দিন নসরৎ শাহের রাজত্বকালে নির্মিত একটি অতি প্রাচীন মসজিদ।

পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামে আনুমানিক ১৭১৬ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ান শরীফ ও তার স্ত্রী জয়নব বিবি নির্মিত মোগল স্থাপত্যরীতির একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে।

এ অঞ্চলের জনসাধারণের আধ্যাতিক ও নৈতিক জীবনে যাঁদের প্রভাব আলোকবর্তিকা রূপে কাজ করেছে সে সব পীর আউলিয়াদের পবিত্র মাজার শরীফ রয়েছে। নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনের অনতিদুরে পশ্চিমদিকে তরোয়া গ্রামে হযরত কাবুল শাহের মাজার, কুমরাদী গ্রামে হযরত শাহ মনসুরের মাজার, পাটুলী ইউনিয়নের হযরত শাহ ইরানীমাজার, ওয়ারী গ্রামে হযরত সোলায়মানের মাজার এবং পারুলিয়া দেওয়ান সাহেবের মাজার বিশেষভাবে উলে­খযোগ্য।

Share:

আজীবন অপরাজিত ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)

আমি শাহাদাতের ইচ্ছা নিয়ে এত বেশি যুদ্ধে লড়াই করেছি যে আমার শরীরের কোনো অংশ ক্ষতচিহ্নহীন নেই যা বর্শা বা তলোয়ারের আঘাতের কারণে হয়নি এরপরেও আমি এখানে, বিছানায় পড়ে একটি বৃদ্ধ উটের মতো মারা যাচ্ছি কাপুরুষদের চোখ যাতে কখনো শান্তি না পায়

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)



খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসে এক মহান সেনাপতি যিনি রণক্ষেত্রে নিজের শক্তি মেধার দ্বারা ইসলামের ঝান্ডাকে বুলন্দ করেছিলেন বাহাদুরী, সাহসিকতা, উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ম মেধাসম্পন্ন, অত্যধিক ক্ষিপ্রতা এবং শত্রুর উপর অকল্পনীয় আঘাত হানার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)  ইসলাম গ্রহণের পর কোন যুদ্ধে পরাজিত হননি ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)মাত্র ১৪ বছর জীবিত ছিলেন অল্প সময়েই তিনি মোট ১৫০ টি ছোট-বড় যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন দ্রুত সম্প্রসারমান ইসলামী সাম্রাজ্য খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)  সময়েই মুসলমানদের হস্তাগত হয়

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) নেতৃত্বে মুতার যুদ্ধে বাইজেন্টাইন মুসলমানদের দখলে আসে রোমানদের বিপক্ষে এটি মুসলিমদের প্রথম লড়াই ছিল এই যুদ্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)  নয়টি তলোয়ার ভেঙে গিয়েছিল যুদ্ধে সেনাপতি জায়িদ ইবনে হারেসা , জাফর ইবনে আবি তালিব আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ক্রমান্বয়ে নিহত হওয়ার পর খালিদ সেনাপতি হিসেবে ভার নিয়েছিলেন এসময় তার অধীনে মাত্র ,০০০ সৈনিক ছিল অন্যদিকে বাইজেন্টাইন তাদের মিত্র গাসানি আরবদের ছিল ১০,০০০ সৈনিক এই কঠিন পরিস্থিতিতে খালিদ মুসলিম সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন কৌশল প্রয়োগ করে তিনি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পরিস্থিতি থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন খালিদ এর রণনিপুণতায় খুশি হয়ে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাসুল (সা.) তাকেসাইফুল্লাহঅর্থাৎ আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন তিনি মহানবী (সা.) এর জীবদ্দশায় মক্কা বিজয়, হুনাইনের যুদ্ধ, তায়েফ বিজয়, তাবুক অভিযান বিদায় হজে অংশগ্রহণ করেন তিনি খলিফা আবুবকর খলিফা ওমর (রা.) এর খিলাফতকালে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব প্রদর্শন করেন

অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমনের পর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) ইরাক অভিমুখে রওয়ানা দেন আনবার, আইনুত তামুর, দুমা, হীরা সোনা প্রভৃতি অঞ্চল অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিজয় লাভ করেন ফোরাতের এক তীরে মুসলিম বাহিনী অপর তীরে ইরাকী বাহিনী ইরাকীদের প্রস্তাবমতে তাদেরকে নদী পার হবার সুযোগ দিলে তারা নদী পার হয় মুসলিম বাহিনী শত্রু বাহিনীকে তিন দিক ঘিরে ফেলে তাদের পিছনে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালা বিশাল নদী সামনে মুসলিম সৈন্যদের তরবারীর ভেদ পিছনে সুবিশাল সমুদ্র পালানোর কোন পথ নেই সামনে অতিক্রম করলে তরবারীর আঘাত আর পিছনে ফিরে গেলে ডুবে মরা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় ছিল না অতঃপর মুসলিম বাহিনী শত্রু পক্ষকে কঠিনভাবে আক্রমণ করে ফলে মুসলমানগণ বিজয় লাভ করেন রাসুল (সা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ কেসাইফুল্লাহঅর্থাৎ আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন 

ইরাক জয়ের পরপরই খালিদ (রাঃ) খলীফার নির্দেশে বসরায় যান পূর্বে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগদান করেন খালিদ সেখানে পৌঁছেই বসরায় আক্রমণ করেন তার আক্রমণে হতভম্ব হয়ে বসরাবাসী ৬৩৮ খৃষ্টাব্দে তাদের শান্তি চুক্তি করে এরপর খালিদ সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন সিরিয়ায় অভিযানের প্রথমেই খালিদ দামেশক অবরোধ করেন সেখানে খালিদ প্রায় ছয়মাস অবরোধ করে রাখেন কিন্তু দুর্গ প্রাচীর অতিক্রম করতে পারেন নি সময় এক পাদ্রীর পুত্র সন্তান জন্মের কারণে আনন্দে নগরীর অধিবাসীরা মদপানে মত্ত ছিল তাই সময় বুঝে একদিন রাতে খালিদ তাঁর কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে দুর্গ প্রাচীর অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করেন দ্বাররক্ষীদের হত্যা করেন ফলে নগরের প্রধান ফটক মুসলমানদের নিকট উন্মুক্ত হয় অকস্মাৎ আক্রমণে ভীত হয়ে তারা তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে মুসলমানদের সাথে সন্ধি করে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান বিভিন্ন কমান্ডার পৃথকভাবে সৈন্য পরিচালনা করছেন তখন খালিদ যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে এক গুরুগম্ভীর ভাষণ প্রদান করেন তিনি বলেন, ‘আজকে দিন আল্লাহ্র নিকট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন তোমরা গর্ব অহংকার থেকে বিরত থাক তোমরা খালেছভাবে যুদ্ধ কর তোমাদের কাজের জন্য প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা কর এসো আমরা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করি কেউ আজ কেউ আগামী কেউ পরশু আমীর হই আর আজকের দিন আমার উপর ছেড়ে দাও অতঃপর তাঁর এই তেজোদীপ্ত বক্তব্য সকলে সমর্থন দিল প্রধান সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে খালিদ মুসলিম সেনাদলকে এমনভাবে বিন্যস্ত করলেন যে আরবরা কোনদিন এমন বিন্যস্তকরণ চোখে দেখেনি অতঃপর তুমুল যুদ্ধ শুরু হল রোমানরা এমনভাবে আক্রমণ করল যে আরবরা এরকম বিপদে ইতিপূর্বে কখনও নিমজ্জিত হয়নি মুসলিম বাহিনীর মাঝখানের দায়িত্বে ছিলেন কাকা ইকরামা খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)  তাদেরকে সমস্ত মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন ফলে যুদ্ধ সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করল হযরত খালিদও তীব্র আক্রমণ চালালেন তিনি যে দিক গেলেন সে দিকের রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তাদের শোচনীয় পরাজয় হল যুদ্ধে লক্ষাধিক রোমান সৈন্য নিহত হয় 

এরপর মুসলমানরা জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করে অবরোধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপ্রধানদের মধ্যে খালিদও ছিলেন একজন বায়তুল মুকাদ্দাসের অধিবাসীরা বাঁচার কোন পথ না পেয়ে স্বয়ং উমার (রাঃ)-এর নিকট সন্ধিচুক্তি করার প্রস্তাব দেন তাদের অনুরোধে উমার (রাঃ) সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন এভাবেই প্রত্যেক যুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালীদের সুতীক্ষ্ম সাহসিকতাপূর্ণ নেতৃত্ব প্রদান করে ইসলামের বিজয় পতাকা বিশ্বের ময়দানে উড্ডীন করেন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের প্রধান সেনাপতি মাহানের অধীনে অস্ত্রসস্ত্রে সুসজ্জিত দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্য বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলো ইয়ারমুকের যুদ্ধে মাহান দূতের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর সাথে কথা বলার প্রস্তাব দেয় ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রোমক সেনাপতির শিবিরে গিয়ে পৌঁছেন খালিদ সেনাপতি মাহানের উদ্দেশ্য ছিলো ভয় ভীতি, শান শওকত ঐশ্বর্য দেখিয়ে মুসলিমদের দূর্বল করা কিন্তু খালিদ যখন স্বর্ণ রৌপ্য নির্মিত কারুকার্য-খচিত চেয়ারগুলো সরিয়ে রেখে নিঃসংকোচে মেঝেতে আসন গ্রহণ করলেন, তখন সেনাপতি মাহান নিজেই মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়েন আলোচনা হয় মাহান প্রস্তাব দেন মুসলমানরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে বিনিময়ে প্রত্যেক মুসলিম সৈন্যকে একশত দিনার, মুসলিম সেনাপতিকে তিনশত দিনার এবং খলিফাকে দশ হাজার দিনার দান করবে কিন্তু দুটি পাল্টা প্রস্তাব রাখলেন ইসলাম গ্রহণ করুন নতুবা যিযিয়া দিন রোমক সেনাপতি দাম্ভিকতার সঙ্গে প্রত্যাখান করে, তরবারির মাধ্যমে ফয়সালার ঘোষণা দেন খালিদ বিন ওয়ালিদ স্পষ্ট অথচ কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন, যুদ্ধের বাসনা তোমাদের চেয়ে আমাদেরই বেশি এবং আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরাজিত করব আর বন্দি করে খলিফার দরবারে হাজির করব মাহান তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল, এখনই তোমার সামনে তোমাদের পাঁচজন সঙ্গীকে হত্যা করছি দুই লক্ষাধিক সৈন্য বাহিনীর সামনে সেনাপতি মাহানকে জিন্মি করে ১০০ অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্যকে নিয়ে স্বীয় তাঁবুতে ফিরে আসেন খালিদ যা ছিল ইয়ারমুক যুদ্ধে জয়লাভের প্রথম পদক্ষেপ পরবর্তীতে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বেই ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয় লাভ করেন

খলীফা উমার (রাঃ) খালিদ (রাঃ)-কে ৬৩৮ খৃষ্টাব্দে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেন খলীফা ওমর (রাঃ) সর্বত্র ঘোষণা দেন যে, ‘আমি খালিদকে আস্থাহীনতা, ক্রোধবশতঃ বা জাতীয় কোন কারণে অপসরণ করিনি শুধুমাত্র কারণে পদচ্যুত করেছি যে, মুসলমানরা জেনে নিক যে, খালিদের শক্তির ওপর ইসলামের বিজয়সমূহ নির্ভরশীল নয় বরং ইসলামের বিজয় আল্লাহর মদদ সাহায্যের উপর নির্ভরশীলপ্রধান সেনাপতি থেকে অব্যহতির পর সাধারণ সৈনিক বেশে বাকি যুদ্ধে শরীক থাকেন খালিদ

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) তার প্রতিটা যুদ্ধে শহিদ হবেন এই আশা নিয়েই বের হতেন কিন্তু শাহাদত তার ভাগ্যে ছিলোনা মৃত্যুর আগে বিছানায় শুয়ে তাই তিনি আফসোস করতেন খালিদের স্ত্রী তাকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন – “আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তলোয়ার) উপাধি দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহর তলোয়ার ভাঙতে পারে না আর তাই আপনি শহিদ হিসেবে নয় বরং বিজয়ী হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন

Share:

Translate

Popular Posts

Recent Posts

Join us

* indicates required